কমলালেবু বিক্রি করেই গড়েছেন আস্ত এক বিদ্যালয়! পদ্মশ্রীতে সম্মানিত কর্ণাটকের ফল বিক্রেতা

কমলালেবু বিক্রি করেই গড়েছেন আস্ত এক বিদ্যালয়! পদ্মশ্রীতে সম্মানিত কর্ণাটকের ফল বিক্রেতা
কমলালেবু বিক্রি করেই গড়েছেন আস্ত এক বিদ্যালয়! পদ্মশ্রীতে সম্মানিত কর্ণাটকের ফল বিক্রেতা

পেশায় সামান্য এক কমলালেবু বিক্রেতা। মাসিক রোজকারও খুব সামান্য। প্রায় টেনেটুনেই চলে নিজের সংসার। কিন্তু তাঁর ইচ্ছাশক্তির জোর অসামান্য। আর সেই ইচ্ছের কাছেই মাথা নোয়াতে বাধ্য আর্থিক প্রতিবন্ধকতা। রোজগারের সামান্য টাকা তিলে তিলে জমিয়েই তিনি গড়ে ফেলেছেন আস্ত এক বিদ্যালয়। ইচ্ছা থাকলেই যে উপায় হয়! এই প্রবাদকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন তিনি।

যাঁর কথা বলছি তিনি কর্ণাটকের এক সামান্য ফল বিক্রেতা, হারেকালা হাজাব্বা। কমলা লেবু বিক্রি করেই তিনি ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো। তার-ই স্বীকৃতি স্বরূপ এবার তিনি ভূষিত হলেন পদ্মশ্রীতে। ২০২০ সালে এই সম্মান পান তিনি। চলতি বছরের ৮ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের হাত থেকে তুলে নিলেন সেই সম্মান। তাঁর ইচ্ছাশক্তি দেখে অভিভূত সারা দেশ। ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বড় যে আর কিছুই নয়, এই ফল বিক্রেতাকে দেখেই তা যেন ফের প্রমাণিত হয়।

কর্ণাটকের নিউপাদাপু গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব হারেকালার সংসার পুরোটাই চলে ফল বিক্রির রোজগারে। রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি ফেরি করে কমলালেবু বিক্রি করেই ‘দিন আনি দিন খাই’ হারেকালার দিন কাটত। তবে এই স্বল্প রোজগারের টাকা জমিয়েই ২০০০ সালে নিজের গ্রামে গড়ে তোলেন একটি বিদ্যালয়। তারপর থেকে গ্রামের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই বাইরে না গিয়ে সেই বিদ্যালয়েই শিক্ষা লাভের জন্য আসতে থাকে। এমনকি আশেপাশের অন্যান্য গ্রাম থেকেও শিক্ষার্থী এসে ভিড় জমায় হারেকালা প্রতিষ্ঠিত সেই বিদ্যালয়েই। ধীরে ধীরে পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে ঋণ নিয়েই জমি কিনে বিদ্যালয়টির প্রসারের কাজেও হাত লাগান হারেকালা। তাঁর সেই বিদ্যালয়ে বহু দরিদ্র শিশুই শিক্ষা লাভে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৭৫ জন পড়ুয়া শিক্ষার আলো পায়।

কিন্তু হঠাৎ বিদ্যালয় গড়ে তোলার কথা মাথায় এল কেন তাঁর? হারেকালা জানিয়েছেন, একদিন এক বিদেশী দম্পতি বিদেশী ভাষাতেই তাঁর কাছে জানতে চান ফলের দাম। কিন্তু তিনি বুঝতে না পেরে নিরুত্তর থাকলে বাধ্য হয়ে ফল না কিনেই ফিরে যান সেই দম্পতিকে। ঘটনাটির জেরে মন খারাপ হয়ে যায় হারেকালা। এরপরই মনে জেদ আসে, গ্রামের বাকি বাচ্চাদের যাতে ভবিষ্যতে এরকম ভাষা সমস্যায় না পড়তে হয় তার ব্যবস্থা করবেন। তখন গ্রামে কোনও বিদ্যালয় না থাকায় হারেকালা সিদ্ধান্ত নেন গ্রামে এক বিদ্যালয় গড়ে তোলার। তারপরই থেকেই শুরু তাঁর এই শিক্ষার লড়াই। যার স্বীকৃতি স্বরূপ হাতে উঠল পদ্মশ্রী সম্মান।

স্কুল তো খুলেছেন, তবে আগামী দিনে হারেকালার ইচ্ছা গ্রামে যেন একটি কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু মানুষ তাঁকে স্কুলের জন্য অনুদান দেন। সেই টাকা এবং নিজের জমানো পুঁজি দিয়েই একটি জমি কিনে সেখানে কলেজ বানানোর পরিকল্পনা করছেন হরেকালা। আসলে গ্রাম বা আশেপাশের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে সদা তৎপর এই ফল বিক্রেতা। তাঁর এই চেষ্টার প্রশংসায় পঞ্চমুখ গ্রামের লোকজনও। দেশের সামান্য দরিদ্র এক নাগরিক হয়েও নিজের কাজের মাধ্যমে আজ প্রকৃত দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন এই ফল বিক্রেতা। আগামীর কাছে তিনি যেন এক অনুপ্রেরণাই বটে।