মৃত প্রথম কন্যার নামেই সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতে চান আহিরীটোলার গৃহবধূ গঙ্গা ঘড়ুই

মৃত প্রথম কন্যার নামেই সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতে চান আহিরীটোলার গৃহবধূ গঙ্গা ঘড়ুই / প্রতীকী ছবি
মৃত প্রথম কন্যার নামেই সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতে চান আহিরীটোলার গৃহবধূ গঙ্গা ঘড়ুই / প্রতীকী ছবি

মায়ের কোল খালি হওয়ার দিনই ফের ভরে উঠেছিল কোল। প্রথম সন্তানকে হারানোর দিনেই দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন আহিরীটোলার সেই গৃহবধূ গঙ্গা ঘড়ুই। আর জন্মের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে সেই সদ্যোজাতকে কাছে পেলেন মা। তিন বছরের শিশুকন্যাকে হারিয়ে নবজাতক কন্যার স্পর্শ পেয়েই কান্নায় ভেঙে পড়লেন গঙ্গা। আর তাকে কোলে নিয়েই গৃহবধূ জানালেন, দিদির নামেই বোনের নাম রাখবেন তিনি।

বুধবারই অতিবৃষ্টির কারণে ভোর নাগাদ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে আহিরীটোলা স্ট্রিটের একটি বাড়ি। সেই বাড়ির ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়ে যান গঙ্গা, তাঁর তিন বছরের মেয়ে সৃজিতা, স্বামী সুশান্ত ও মা চাঁপা। এরপর বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সাহায্যে বাড়ির বাইরে বেরোতে সক্ষম হন সুশান্ত ও গঙ্গা। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তাঁদের তিন বছরের শিশুকন্যা ও মা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। শত চেষ্টাতেও তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে গঙ্গা ঘড়ুই তখন সন্তানসম্ভবা। এমন অবস্থায় গর্ভবতী গৃহবধূকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালানো হলেও তিনি সন্তান উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত যেতে রাজি হননি। সন্তানকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করেই তিনি যাবেন এমন মরিয়া জেদ ধরেছিলেন। অবশেষে জোর করেই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে চাপানো হয়। নিয়ে যাওয়া হয় আরজিকর হাসপাতালে।

মৃত প্রথম কন্যার নামেই সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতে চান আহিরীটোলার গৃহবধূ গঙ্গা ঘড়ুই
মৃত প্রথম কন্যার নামেই সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতে চান আহিরীটোলার গৃহবধূ গঙ্গা ঘড়ুই

এদিকে তখনও খুদে শিশু কন্যাকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল। প্রায় সাত ঘণ্টা পর অবশেষে উদ্ধার করা হয় খুদে ও তার দিদিমাকে। সন্তান উদ্ধারের খবরটি লেবার রুমে প্রবেশ করার আগেই জানানো হয় গৃহবধূটিকে। কিন্তু শিশু কন্যাটিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তার প্রাণ বাঁচানো যায়নি। মারা যান গঙ্গার মাও। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এই গৃহবধূ। হাসপাতাল সূত্রের খবর, দুপুর ২টো ২০ মিনিট নাগাদ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন গঙ্গা। কিন্তু তখন বাচ্চা সামলানোর মতো অবস্থায় ছিলেন না মা। ফলে সদ্যোজাতকে আলাদা রাখা হয়েছিল৷

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, হাসপাতালে পৌঁছেও জ্ঞান ছিল ওই গৃহবধূর জ্ঞান ছিল। তখন তিনি নিজেই জানান, তাঁর বড় মেয়ে হয়তো আর বেঁচে নেই। রোগীর ওই অবস্থা দেখে চিকিৎসকেরা দ্রুত অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন। অন্য আরেক চিকিৎসক জানান, গৃহবধূটির পায়ে গুরুতর চোট লেগেছিল। তিনি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় চোট কতটা তা বোঝা যায়নি। এক্স রে-ও করা যায়নি। সেই সময়ে বাচ্চা এবং মাকে বাঁচাতে অস্থি চিকিৎসক এবং অ্যানাস্থেটিস্টের উপস্থিতিতে দ্রুত অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

হাসপাতাল সূত্রের খবর, গঙ্গা এখন স্থিতিশীল। তবে এদিন দুপুরে সুশান্তের আচমকা বুকে ব্যথা শুরু হওয়ায় ফের তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। যদিও এখন তিনিও সুস্থ রয়েছেন। এদিকে সদ্যোজাতকে নিয়ে চিকিৎসকদের অবশ্য কিছুটা চিন্তা ছিল। হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কথায়, এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় বাচ্চার খাবার নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। বাচ্চা যেহেতু মায়ের বুকের দুধ পাচ্ছে না, তাই কৃত্রিম খাবারেই ভরসা রাখতে হয়েছিল। তবে বিষয়টা দীর্ঘকালীন হলে হলে অন্য ভাবে বুকের দুধের ব্যবস্থা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অন্য রোগীরাও এই শিশুটির জন্যও এগিয়ে এসেছিলেন। তবে অস্ত্রোপচারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের কাছে সদ্যোজাতকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্তান কোলে নিয়ে সদ্য হারানো প্রথম কন্যার নামেই দ্বিতীয় কন্যার নাম রাখার কথা ভেবেছেন ওই গৃহবধূ।