মৃত্যুতেও অমলিন সেই হাসি! মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যকৌতুকময় অভিনয়ের দিকপাল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

মৃত্যুতেও অমলিন সেই হাসি! মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যকৌতুকময় অভিনয়ের দিকপাল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়
মৃত্যুতেও অমলিন সেই হাসি! মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যকৌতুকময় অভিনয়ের দিকপাল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় / ফাইল ছবি

বংনিউজ২৪x৭ডিজিটাল ডেস্কঃ মৃত্যুর পরও হাসাতে পারেন, এমন মানুষ বোধহয় খুব কম আছেন! আর এই দলে প্রথমেই যার নাম করতে হয়, তিনি আর কেউ নন বাংলা চলচ্চিত্রের অদ্বিতীয়, প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। আজকের দিনেই পরলোকগমন করেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য, আরও একবার এই মহান অভিনেতাকে ফিরে দেখা, জানার এক প্রচেষ্টা।

‘মাসিমা মালপো খামু…’ এই একটি সংলাপ মনে আছে নিশ্চয়ই। এই অতি জনপ্রিয় সংলাপ বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তনভাবে থেকে যাবে, কখনই ভোলার নয়। ছোটখাট চেহারার এক ব্যক্তি, সহজ-সরল, ছাপোষা আদ্যোন্ত বাঙালিয়ানায় মোড়া… এক্সপ্রেশনেই যিনি পর্দায় বাজিমাত করতেন! তিনি আর কেউ নন, অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁর হাত ধরেই চলচ্চিত্র প্রেমী বাঙালির কৌতূকরসের সিনেমার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল।

যেমন দক্ষ কৌতুকশিল্পী, ঠিক ততোটাই দক্ষ যেকোনো গুরুগম্ভীর চরিত্রে। দুই ক্ষেত্রেই তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে বাজিমাত করতেন। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘ভানু পেলো লটারী’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় নামটা শুনলেই এধরনের বহু ক্লাসিক বাংলা চলচ্চিত্রের বিভিন্ন জনপ্রিয় দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যার মাধুর্য আজও শুরুর দিনের মতোই একইরকম সজীব।

তাই তো মৃত্যুও তাঁকে বাঙালি তথা সিনেপ্রেমী মানুষের মন থেকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। মৃত্যুর পর আজও তিনি যে বাঙালি দর্শকদের মনে সমুজ্জ্বল, তা বোধহয় উপরোক্ত সিনেমাগুলি নিয়ে আজও মানুষের আবেগ, উন্মাদনা দেখলেই বোঝা যায়।

২৬ শে অগস্ট, ১৯২০ সালে তৎকালীন বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে জন্ম হয় এক নক্ষত্রের, সাম্যময় বন্দ্যো্পাধ্যায় ওরফে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। নিঃসন্দেহে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্য‍তম সেরা অভিনেতা। বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা। বিশেষ করে, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যকৌতুকময় অভিনয়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এককথায় দিকপাল। হাস্যরসের সারবস্তুটিকে সঠিকভাবে সেলুলয়েডের পর্দায় কীভাবে তুলে ধরতে হয়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় তার বড় প্রমাণ। এই কাজে তাঁর জুড়ি মেলা ছিল ভার।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি’স হাইস্কুল এবং জগন্নাথ কলেজে শিক্ষা শেষ করে, কলকাতায় আসেন ১৯৪১ সালে। এখানে এসে তিনি আয়রন এন্ড স্টীল কম্পানি নামে একটি সরকারি অফিসে যোগ দেন এবং বালীগঞ্জের অশ্বিনী দত্ত রোডে নিজের বোনের কাছে দু’বছর থাকার পর, টালিগঞ্জের চারু অ্যাভিনিউ-তে বসবাস শুরু করেন।

ভানুর অভিনয়-জীবনের শুভ সূচনা হয় ১৯৪৭ সালে। প্রথম ছবি ‘জাগরণ’। সেই বছরই ‘অভিযোগ’ নামে অন্য আরও একটি ছবি মুক্তি পায়। এরপর ধীরে ধীরে ছবির সংখ্যা বাড়তে থাকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘মন্ত্রমুগ্ধ’(১৯৪৯), ‘বরযাত্রী’(১৯৫১) এবং ‘পাশের বাড়ি’(১৯৫২)। ১৯৫২ সালে ‘পাশের বাড়ি’ ও ‘বসু পরিবার’-এ তাঁর সাফল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এর পরের বছর, ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় নির্মল দে পরিচালিত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। এই ছবিতে তাঁর বলা ‘মাসিমা, মালপোয়া খামু’ সংলাপটি আজও অমর। এই দৃশ্যটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে, তাঁকে নাকি ২৪টি মালপোয়া খেতে হয়েছিল।

অন্যদিকে এর পরের বছর মুক্তি পায় ‘ওরা থাকে ওধারে’। ১৯৫৮ সালটিতে মুক্তি পাওয়া অনেক উল্লেখ্যযোগ্য ছবির মধ্যে অন্যতম দু’টি ছিল ‘ভানু পেল লটারি’এবং ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’। পরের বছর ১৯৫৯-এ মুক্তি পায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নায়কের ভূমিকায় অভিনীত চলচ্চিত্র। সেটি হল- ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ এই ছবিতে ভানুর বিপরীতে ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘৮০ তে আসিও না’ ছবিটিতেও ভানু নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন, এবং এখানেও ওনার বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা।

একই বছর, ১৯৬৭ সালে ভানুর আরো একটি ছবি মুক্তি পায়, এই ছবিতে দর্শক ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে অন্যরূপে আবিষ্কার করেন। ছবির নাম ‘মিস প্রিয়ংবদা’– এই চলচ্চিত্রে উনি মহিলা সেজে অভিনয় করেন। এখানে ওনার বিপরীতে ছিলেন লিলি চক্রবর্তী। ভানুর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। এই ছবিতে বাঙালি দর্শক আরও এক মহান অভিনেতার অভিনয়ের সাক্ষী থেকেছে মানুষ, তিনি জহর রায়।

বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্য’তম সেরা একজন অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, এ প্রসঙ্গে কোনও দ্বিমত নেই। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাযসিস্ট্যান্ট’, ‘৮০তে আসিও না’, ‘ভানু পেলো লটারী’, ‘মিস প্রিয়ংবদা’ একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের মেধা দিয়ে যিনি জয় করেছিলেন মানুষের হৃদয়।

অন্যদিকে শখের অভিনয়ও চলত। পাড়ায় ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে চাণক্য হওয়ার সুবাদে সোজা বিভূতি চক্রবর্তীর ‘জাগরণ’ (১৯৪৭) ছবিতে আত্মপ্রকাশ, এক দুর্ভিক্ষপীড়িত চরিত্রে। ভানুর শেষ ছবি ‘শোরগোল’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৪-তে। এর কিছুদিন পরেই তিনি পরলোকগমন করেন।

৩০০ এরও বেশি বাংলা সিনেমায় তাঁর অভিনয় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে যুগ-যুগান্ত ধরে। অমর হয়ে থাকবেন তিনি চলচ্চিত্রপ্রেমী বাঙালির হৃদয়ে। তাই তো, তাঁর গৌরবোজ্জ্বল শিল্পকর্ম সেযুগে গ্রামোফোন রেকর্ড, বেতার, টেপ রেকর্ডার, থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীকালে ডিভিডি, সিডি, রঙিন টিভি হয়ে বর্তমানে এন্ড্রয়েড মোবাইল ইন্টারনেটে আজও অনবদ্য।

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন.