রাতের আঁধারে ছত্রধর মাহাতোর গ্রেফতারি ঘিরে উত্তেজনা জঙ্গলমহলে, বিতর্ক অ্যারেস্ট মেমো নিয়ে

রাতের আঁধারে ছত্রধর মাহাতোর গ্রেফতারি ঘিরে উত্তেজনা জঙ্গলমহলে, বিতর্ক অ্যারেস্ট মেমো নিয়ে
রাতের আঁধারে ছত্রধর মাহাতোর গ্রেফতারি ঘিরে উত্তেজনা জঙ্গলমহলে, বিতর্ক অ্যারেস্ট মেমো নিয়ে

দীর্ঘ এগারো বছর পর নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার পরেই রবিবার ভোর রাতে তৃণমুলের অন্যতম রাজ্য সম্পাদক ছত্রধর মাহাতকে গ্রেফতার করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। ঝাড়গ্রামের লালগড়ের আমলিয়া গ্রামের বাড়ি থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করে। বাড়ির ভেতর থেকে ছত্রধর বাবুকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করিয়ে আনেন বলে অভিযোগ করেন তার পরিবারের লোকজনেরা।

২০০৯ সালে সিপিআইএম নেতা প্রবীর মাহাতো খুনের ঘটনা-সহ একাধিক জঙ্গলমহলের পুরনো মামলায় ছত্রধর মাহাতোকে সমন পাঠাচ্ছিল এনআইএ। কিন্তু গুরুত্ব না দেওয়ায় লালগড়ের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করল এনআইএ। । আদালতের নির্দেশ ছিল তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না। তবুও কেন আদালতের স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও এই ভাবে একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে তা নিয়ে যেমন বিতর্ক দানা বেঁধেছে তেমনি প্রশ্ন উঠেছে অ্যারেস্ট মেমো নিয়েও। ছত্রধর মাহাতোর গ্রেফতারির জেরে এদিন সকাল থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে জঙ্গলমহলে।

রবিবার নিয়তি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাত ৩টে নাগাদ প্রায় ৪০ জনের একটি বাহিনী হাজির হয় লালগড়ের নতুন পাকা বাড়ির কাছে। দরজায় টোকা দিতে ছত্রধর মাহাতোর বড় ছেলে দরজা খোলে। তখনই এনআইএ-র লোকজন ভেতরে ঢুকে সেখানে থাকা ছত্রধর মাহাতোর নিরাপত্তারক্ষী ও ছেলেদের সমস্ত মোবাইল গুলি আগে নিয়ে নেয়। এরপর ছত্রধর মাহাতো সেখানে রয়েছে কিনা ভালো করে পরীক্ষা করে নেয় পুরো বিল্ডিংটি। বেশ কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছত্রধর মাহাতোর ছেলে ও নিরাপত্তা রক্ষীদের। তারপর এনআইএ-র টিম সেখান থেকে সকলে বেরিয়ে যায় ছত্রধর মাহাতোর আমলিয়া গ্রামের ভেতরে থাকা পুরনো মাটির বাড়ির কাছে।

নিয়তী মাহাতোর অভিযোগ-খালি গায়ের গামছা পরা অবস্থাতেই রীতিমতো টানাহেঁচড়া চলে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীকে কেন গ্রেফতার করা হল তা আমাকে বলেনি। আমাকে কোনও অ্যারেস্ট মেমো দেয়নি। ওকে এনআইএ নিয়ে গেল না বিজেপি নিয়ে গেল তা বুঝতে পারছি না। এনআইএ’র তরফে জানানো হলে বুঝতে পারবো। আমি আমাদের আইনজীবিকে ও লালগড় থানায় জানিয়েছি। সকাল পর্যন্ত এনআইএ আমাকে কিছু জানানি।” যদিও এনআইএ’র তরফে দাবি করা হয়েছে, অ্যারেস্ট মেমো গ্রহণ করতে চাননি খোদ নিয়তি মাহাতো।অন্যদিকে এই বিষয়ে ঝাড়গ্রাম জেলা পুলিশ সুপার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের কাছে ছত্রধর মাহাতোকে গ্রেফতারের কোন আগাম ইনফরমেশন ছিল না।গ্রেফতার হওয়ার পরই আমরা জানতে পারি।”

এদিন ছত্রধর মাহাতোকে গ্রেফতারের পর কলকাতায় নিয়ে যায়। সেখানে কলকাতায় এনআইএ’র বিশেষ আদালতে তাঁকে পেশ করা হয়। জাতীয় তদন্তকারী দলের অভিযোগ, মামলার তদন্তে সহযোগিতা করছিলেন না প্রাক্তন মাওবাদী নেতা। তাই আদালতের নির্দেশে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আগে থেকেই আশঙ্কা ছিল পুরনো মামলাগুলিতে এনআইএ’র তদন্তে সহযোগিতা না করলে গ্রেফতার হতে পারেন জনসাধারণ কমিটির প্রাক্তন নেতা তথা বর্তমানে তৃণমূলের রাজ্য কমিটির সম্পাদক ছত্রধর মাহাতো। এনআইএ সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ১৬, ১৮ এবং ২২ তারিখ ছত্রধর মাহাতোকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছিল। তিনি হাজিরা দেননি। পরে ফের ২৬ তারিখ তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। ওইদিন প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এনআইএ র তদন্তকারীরা। কিন্তু রবিবার ভোরে আচমকাই তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে প্রায় ৪০ জনের একটি দল হাজির হয় লালগড়ে, ছত্রধরের বাড়িতে। সেখান থেকে সরাসরি গ্রেপ্তার করে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা।এই মুহূর্তে ছত্রধর মাহাতোর দুটি মামলায় অভিযুক্ত রয়েছে ২০০৯ সালে রাজধানী এক্সপ্রেসে নাশকতার চেষ্টা এবং ওই বছরেই লালগড়ের সিপিএম নেতা প্রবীর মাহাতো হত্যাকাণ্ড কান্ডে নাম জড়ায় তাঁর।

এই দুই মামলাতেই দীর্ঘ সময় পর তদন্তভার হাতে নেয় এনআইএ। এরপর ছাত্রধরকে কয়েক দফায় জেরাও করেন তদন্তকারীরা। তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেয়ে বিশেষ আদালতের দ্বারস্থ হয় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। গত ২২ অক্টোবর এনআইএ-এর বিশেষ আদালত নির্দেশ দেয়, যেহেতু ঝাড়গ্রাম নিম্ন আদালত এই মামলায় ছত্রধর-সহ অন্য অভিযুক্তদের জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাই তিনি এবং বাকি পাঁচ অভিযুক্তের জামিন খারিজের জন্য এনআইএ-কে সেখানেই আবেদন করতে হবে।এরপরই ছত্রধরকে হেফাজতে চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় তদন্তকারী সংস্থা। কিন্তু প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে এনআইএ’র সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তবে এরপরও রেহাই মিলল না ছত্রধর মাহাতোর। জঙ্গলমহলে ভোট মিটতেই গ্রেফতার হতে হল তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক ছত্রধর মাহাতোকে।

এদিকে ছত্রধর মাহাতোর আইনজীবি কৌশিক সিনহা বলেন, ” ছত্রধর মাহাতোর স্ত্রীর আমাকে ফোন করে জানানোর পর আমি জানতে পারি তাঁকে নিয়ে গেছে বলে। এনআইএ গ্রেফতারের কোনো কাগজপত্র না দেখিয়ে বা বাড়ির লোককে কি জন্য নিয়ে যাচ্ছেন সেবিষয়ে অবগত না করে সম্পূর্ণ অনৈতিক ভাবে তাকে নিয়ে গিয়েছে। এই মুর্হুতে তার কোনো মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নেই। যে দুটি মামলা এনআইএ র আদালতে চলছে তার একটি মামলাতে ২৫ মার্চ কলকাতার উচ্চ আদালত থেকে রায় হয়েছে তাতে সপ্তাহে তিন দিন করে এনআইএ র শাখা যে রয়েছে সেখানে দেখা করতে হবে। সেই মোতাবেক ২৫ তারিখ ছত্রধর সহ চারজন সেখানে গিয়ে দেখা করেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। পরে ২৭ তারিখ নিজে ভোট দিয়েছেন। তারপর আশ্চর্যজনক ভাবে এনআইএ একটি দল তাকে গ্রেফতার করেছে। আর রাজধানী মামলার হয়েছে ২০১০ সালে অক্টোবর মাসে। আর ছত্রধর মাহাতোকে গ্রেফতার করেছে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। রাজধানী মামলার সময় তিনি জেলে ছিলেন।ফলে এই মামলাতে তাঁকে আসামী করা আইনগত ভাবে একটা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আর তিনি সহযোগিতা করার পরেও তাকে আটক করা হয়েছে। আসলে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় তাঁকে আটক করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।”

ইতিমধ্যেই ছত্রধর মাহাতোর গ্রেফতারি নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তৃণমূলের পক্ষে থেকে দলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ জানিয়েছেন, ‘সময়ের বিচারে এই গ্রেফতারি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক। মামলার ‘মেরিট’ নিয়ে আমার বা দলের কিছু বলার নেই এই মুহূর্তে। কিন্তু টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে আমাদের। এত বছরের পুরনো একটি মামলায় কেন ভোটের মধ্যে তৃণমূল নেতাকে বার বার জেরার জন্য ডাকা হচ্ছিল এবং প্রথম দফার ভোট মিটতেই কেন তড়িঘড়ি তাঁকে গ্রেফতার করা হল প্রশ্ন রয়েছে তাই নিয়েও। তৃণমূল যখন জঙ্গলমহলে নিজেদের হারানো জমি ফিরে পাচ্ছে তখনিই এই ধরণের পুরোনো মামলায় ছত্রধরের গ্রেফতারির পেছনে রাজনৈতিক হাত দেখা যাচ্ছে। তবে এইভাবে জঙ্গলমহলে তৃণমূলের সংগঠনকে ভাঙা যাবে না। বরং আরও শক্তিশালী হয়ে জঙ্গলমহলের ব্যালটবক্সে এর জবাব দেবে সেখানকার মানুষ।’

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন.