বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর সাথে জড়িয়ে আছে নানা কাহিনি! আজকের পর্বে শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি

বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর সাথে জড়িয়ে আছে নানা কাহিনি! শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি
বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর সাথে জড়িয়ে আছে নানা কাহিনি! আজকের পর্বে শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি

সুব্রত ঘোষ: আগের বার বলেছি নরসিংহ দাঁ-এর বাড়ির পুজোর কথা। এবার আসছে জোড়াসাঁকোতেই আরেকটি দাঁ বাড়ি – শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির পূজোর কথা।

১৮৪০ সালে এই পুজো প্রচলন করেন শিবকৃষ্ণ দাঁ। দাঁ পরিবারের আদি বসতি ছিল বর্ধমানের সাতগাছিয়ায়। তার পর কলকাতায় জোড়াসাঁকো এলাকায় বাড়ি তৈরি করে চলে আসেন গোকুলচন্দ্র দাঁ। গোকুলচন্দ্রের পুত্র শিবকৃষ্ণ ছিলেন সেই সময়কার নামজাদা ব্যবসায়ী। গন্ধক আর লোহা, কাঠকয়লার ব্যবসায় সুনাম ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন শিবকৃষ্ণ। পরে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত করেন কোলিয়ারির ব্যবসা। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে‌ তিনিই দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন,যা এখনও নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। ( যদিও কোন কোন জায়গায় দেখছি শিবকৃষ্ণ নন, এই বাড়ির পূজো শুরু করেছিলেন – গোকুলচন্দ্রই ) । তবে,পূজোর কথায় যাওয়ার আগে এই বাড়ির স্থাপত্য নিয়ে কিছু বলে নেওয়া যেতে পারে।

শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি দুর্গা পুজো
শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি দুর্গা পুজো

দাঁ-দের এই বাড়ির স্থাপত্যও বেশ অভিনব। সেকালের অন্যান্য সব পুজোদালানের চেয়ে একেবারেই আলাদা শিবকৃষ্ণ দাঁ পরিবারের এই ঠাকুরদালানটি। এই বাড়ির ভিতরে ঢুকলে মনে হতেই পারে সেকেলে ইউরোপীয় অপেরা হাউসের ব্যালকনির মতো গড়ন – দোতলায় পর পর অর্ধ চন্দ্রাকৃতি বারান্দা। আসলে পরবর্তী কালে এই বংশের উত্তরপুরষ কীর্তিচন্দ্র দাঁ পুরনো বাড়ি এবং ঠাকুরদালানটি সংস্কার করায় বাড়িটি এইরকম অভিনব স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শন হয়ে ওঠে। তার অবশ্য একটা কারণও ছিল। শোনা যায়, কীর্তিচন্দ্রের অভিনয়ের শখ ছিল। ওই দালানের সামনের অংশে এককালে যাত্রা এবং নাটক অভিনীত হত।বাড়ীর মহিলা সদস্যরা সেসব নাটক দেখতেন ওপরের ওই ব্যালকনিগুলো থেকে। আবার এখানকার ঠাকুরদালানটিও অন্যান্য বাড়ীর ঠাকুর দালানের মত খুব উঁচু নয়, তাই দালানের সামনের উঠোন থেকে খুব সহজেই পূজোর দালানে উঠে আসা যায়। আর অন্যান্য বাড়ীর Traditional ঠাকুরদালানের চাইতে এটির গঠনশৈলীও আলাদা।

আরো পড়ুনঃ বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর সাথে জড়িয়ে আছে নানা কাহিনি! আজকের পর্বে নরসিংহ দাঁ -এর বাড়ি

প্রথমে একটি বড় খিলান – যার মাঝখানে আর কোন থাম নেই। সেই খিলানের ওপরে নীল-সাদা কারুকাজ। তার পরে একটি চাতালের পরে তিন খিলানের গর্ভগৃহ। কিন্তু এখানে খিলানের থামগুলি গোলাকৃতি নয়। চৌকো থাম – তার ওপরে খিলানে সোনালি রঙের কারুকার্য। খিলানের ভিতরে সুন্দর কারুকাজ করা ছাদ, আর সেই সঙ্গে একাধিক ঝাড়বাতির শোভা। এছাড়া আছে কিছু পুরনো ছবি। সব মিলিয়ে খুব দৃষ্টিনন্দন এই ঠাকুর দালান।

এবার আসি পূজোর কথায়। পুরনো প্রথা মেনে এই বাড়ির কাঠামো পুজো হয় রথযাত্রার দিন, সুন্দরবনের গরান কাঠে। জন্মাষ্টমীর দিন প্রথমে দেবীর মস্তক স্থাপন করা হয়, তারপর একে একে মাথা স্থাপন করা হয় অন্যদের। সপ্তমীতে এখনও রুপোর ছাতা মাথায় দিয়ে নবপত্রিকা গঙ্গাস্নানে যান। এই ছাতাটির উপরে রয়েছে ভেলভেটের আচ্ছাদন, যার উপরে দশাবতারের ছবি দেখা যায়। ছাতাটির সারা গায়ে রয়েছে সাবেক সলমা চুমকির কাজ। দাঁ বাড়িতে দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী প্রতিমাকে পরানো হয় জরির কাজ করা মেখলা আর আঁচল। প্রতিমার হাতে থাকে রুপোর অস্ত্র। পুজোর যে মূল দেবীঘট, সেটিও রুপোর। অষ্টমী তিথিতে দাঁ বাড়িতে হয় ‘ধুনো পোড়ানো’। সেই সঙ্গে আট বছরের কোন বালিকাকে কুমারী হিসেবে দেব জ্ঞানে পূজো করা হয়। পুজোর কাজে বাড়ির মহিলারা অংশ নিলেও সন্ধি পুজোর নৈবেদ্য সাজান শুধু পুরুষরা। সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে হওয়া এই পুজোয় যে কোনও রকম বলিদান নিষিদ্ধ। মাকে দেওয়া হয় না অন্ন ভোগও। তার বদলে থাকে লুচি আর বাড়িতে তৈরি নানা ধরনের মিষ্টির রকমারি ভোগ। তবে এ বাড়িতে মায়ের পূজোর সাজের একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে – গয়না। তার কথা একটু আলাদা করে বলতেই হয়। শিবকৃষ্ণ ডাকযোগে প্যারিস ও জার্মানি থেকে তবক এবং রাংতা আনাতেন ঠাকুর সাজানোর জন্য। জনশ্রুতি, সেই থেকেই ডাকের সাজ শব্দটি এসেছে। এই রাংতাই ব্যবহার করা হত ডাকের সাজ তৈরি করতে। করে।শেষ বার চল্লিশের দশকে জার্মানি থেকেই এই রাংতা এসেছিল। সেই ডাকের সাজের কিছুটা এখনও চালচিত্রের তবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়,কিছু কলকা এবং ঝালর আজও ব্যবহৃত হয় প্রতিমার চালিতে। তামা আর পিতলের সংমিশ্রণে তৈরি এই তবক এখনও সাদা জলে সামান্য ধুয়ে নিলেই একেবারে নতুন ধাতুর মতোই চকচক করে।

শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি দুর্গা পুজো
শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি দুর্গা পুজো

অনেক জায়গায় দেখছি – শুধু এই রাংতাই নয়, আসল কিছু গয়না এবং পান্নার মত দামী পাথরও আসতো বিদেশ থেকে – মায়ের জন্যে। আসলে এই বাড়িতে খুব জোর দেওয়া হত মায়ের গয়নার ওপরে। আর সেই জন্যে একটা প্রবাদই চালু ছিল তখন যে, কৈলাস থেকে মা প্রথমেই আসেন দাঁ বাড়ীতে গয়না পরতে। মাকে গয়না পরানোর সেই ধারা কিন্তু এখনো চলে আসছে এখানে। এখন প্যারিস কিংবা জার্মানি থেকে আমদানি করা গয়না না এলেও এই পরিবারের দুর্গাপ্রতিমাকে সাজানো হয় নানা ধরনের সোনার গয়নায়। তাই দেবীর অঙ্গে আজও শোভা পায় কুন্দনের চওড়া হার, সীতাহার ছাড়া আরও কয়েকটি হার। গলায় থাকে চিক, কানে বড় ঝুমকো আর কান-বালা। হাতে থাকে বালা, কাঁকন, চূড়। উপর হাতে বাজুবন্ধ। আর থাকে নানা রকমের আংটি।

দেবীর পায়ে থাকে পেট্টি, নূপুর এবং বালা। সিঁথিতে সোনার টায়রা, টিকলি, কপালে টিপ, নাকে নথ, এ ছাড়াও থাকে রুপোর জবাফুল ও বেলপাতা। আবার ঠাকুরের গয়না ছাড়াও পুরনো প্রথা মেনে এই পরিবারের বধূরা পুজোর ক’দিন সোনার গয়না পরেন। তবে বিজয়া দশমীর দিন বরণের সময় নানা ধরনের সোনার গয়না পরা এই পরিবারের এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। বাড়ির বউ-রা সকলেই সেদিন পরেন সোনার নথ। দাঁ বাড়ীর এই গয়নার বৈভব নিয়ে একটি গল্প আছে। শিবকৃষ্ণের আমলে দাঁ বাড়ির পুজোর সঙ্গে রেষারেষি ছিল প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুজোর। সেই সময়ে দাঁ বাড়ি থেকে বিসর্জনের জন্য প্রতিমা নিয়ে বেরিয়ে চিৎপুরের দিকে যেতে হলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া ছাড়া পথ ছিল না। তাতে এই রেষারেষি আরও ইন্ধন পেত। দাঁ বাড়ির প্রতিমা খ্যাত ছিল সাগরপার থেকে আনা সোনার গয়নার জন্য।

শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি দুর্গা পুজো
শিবকৃষ্ণ দাঁ -এর বাড়ি দুর্গা পুজো

বিসর্জনের সময়ে সেই গয়না স্বভাবতই খুলে নেওয়া হত প্রতিমার গা থেকে। কিন্তু একবার প্রিন্স দ্বারকানাথ শিবকৃষ্ণকে টেক্কা দেওয়ার জন্য নিজের বাড়ির প্রতিমা একেবারে সোনার গয়না সমেতই গঙ্গায় বিসর্জন দিয়েছিলেন। এমন কাণ্ড ঘটিয়ে প্রিন্স দ্বারকানাথ সেই সময়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন কলকাতায়। তবে দ্বারকানাথের প্রতিমায় খাঁটি সোনার গয়না সত্যিই ছিল কি না বা এরকম ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল কিনা, নাকি এর পুরোটাই নিছক গল্পকথা, তা নিয়ে সংশয় আছে। এইরকম ভাবে নানা গল্প, কাহিনী, ইতিহাস আর প্রথাকে সঙ্গে নিয়ে এই দাঁ বাড়ীর পূজো আজও অম্লান – এই ১৮১ বছর পরেও।

২০১৭ আর ২০১৯ এর পুজোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখিত।
ছবিঃ সুব্রত ঘোষ
লেখাঃ সুব্রত ঘোষ