দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বন্যার পরিস্থিতি! মোকাবিলায় নেমেছে সেনা ও NDRF

দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বন্যার পরিস্থিতি! মোকাবিলায় নেমেছে সেনা ও NDRF
দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বন্যার পরিস্থিতি! মোকাবিলায় নেমেছে সেনা ও NDRF

বংনিউজ ২৪x৭ ডিজিটাল ডেস্কঃ নিম্নচাপের জেরে টানা ভারী বৃষ্টি এর সঙ্গে জলাধার থেকে জল ছাড়া, এই দুয়ের কারণে রাজ্যের একাধিক জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জেলার একাধিক এলাকা জলমগ্ন।

রাজ্যব্যাপী দুর্যোগ চলছে একটানা। একের পর এক নিম্নচাপের কারণে বৃষ্টি থামার নামই নিচ্ছে না। রাজ্যের একাধিক জেলা জলমগ্ন। পুজোর মুখে রাজ্যে ফের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আসানসোল, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা জলের তলায়। এদিকে, জলস্তর বেড়েছে দামোদর এবং অজয় নদে। পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর, পান্ডবেশ্বর, অন্ডাল, ইলামবাজার, মেজিয়া ও পুরুলিয়ার বিভিন্ন অংশ ডুবে গিয়েছে। জল ঢুকেছে হুগলির খানাকুল, আরামবাগের বিস্তীর্ণ এলাকা। আবার বৃষ্টির জলে ফুঁসছে শিলাবতী, দ্বারকেশ্বর, রুপনারায়ণও। এদিকে, পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল এবং চন্দ্রকোনার পরিস্থিতিও খারাপ। ডিভিসি ও ম্যাসেঞ্জার, তিলিপাড়া ব্যারেজের ছাড়া জলে বানভাসী হয়েছে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর এবং মুর্শিদাবাদের ভরতপুর ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা। জলের তলায় কান্দি-কাটোয়া রাজ্য সড়কও। শীলাবতী, কাঁসাই, ঝুমির মতো নদীগুলির জলস্তর বেড়ে গিয়ে ইতিমধ্যেই ঘাটাল পুরসভার ১৩টি ওয়ার্ড প্লাবিত। ইতিমধ্যেই বহু গ্রামে জল ঢুকেছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন ভোর থেকে ডিভিসি-র ছাড়া জলে কার্যত প্লাবিত হয়েছে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা। দামোদরের কয়েকটি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙেছে। কোথাও আবার নদীবাঁধ উপচে জল এলাকায় ঢুকেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নামানো হয়েছে সেনা। কয়েকটি জায়গায় খোলা হয়েছে ত্রাণ শিবির।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার থেকে ম্যাসেঞ্জার ও তিলিপাড়া জলাধারে থেকে জল ছাড়া শুরু হয়েছে। এর জেরে এদিন ময়ুরাক্ষী নদীর জল উপচে গিয়ে প্লাবিত হয়েছে ভরতপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘর-বাড়ি সহ জলের তলায় চলে গিয়েছে ধানজমি। দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। কান্দি-কাটোয়া রাজ্য সড়কের উপর দিয়েও দু-তিন ফুট উচ্চতায় প্রবল স্রোতে বইছে নদীর জল। এই পরিস্থিতিতে এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফ থেকে কোনও সাহায্য মেলেনি বলেই অভিযোগ জানিয়েছে এলাকাবাসীরা।

অন্যদিকে, হুগলির আরামবাগে বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে সেনা এবং এনডিআরএফ (NDRF)। গত দু’তিন দিনে আরামবাগ ও খানাকুল ব্লকে মোট ৬টি নদীবাঁধ ভেঙেছে। এর মধ্যে গতকাল একটি এবং শুক্রবার অর্থাৎ আজ সকালে একটি বাঁধ ভেঙেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নদীর জল চুকেছে এলাকায়। এমনকি নিচু এলাকার বাড়িগুলি সম্পূর্ণভাবে জলে ডুবে গিয়েছে। আরামবাগের হাসপাতাল রোড, দৌলতপুর সহ বিভিন্ন এলাকার প্রধান রাস্তাও জলমগ্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ডিভিসি থেকে জল ছাড়ার কারণেই এই বিপত্তি। ইতিমধ্যেই সেনা ও এনডিআরএফ-এর দল বন্যা দুর্গতদের উদ্ধার করে স্কুল বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। জেলা পরিষদের সভাধিপতি মেহবুব রহমান জানিয়েছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের দেখাশোনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরামবাগ এবং পুরশুরাতে দুটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

আবার ঘাটালের মনসুকা গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুমি নদীর জলে প্লাবিত হয়েছে। মাইথন ও মুকুটমণিপুর জলাধার থেকে জল ছাড়ায় ঘাটালের বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিভিন্ন রাস্তাঘাট জলমগ্ন হওয়ার কারণে ঘাটাল পুরসভার পক্ষ থেকে খেয়া পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘাটাল মহকুমা প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে। হু হু করে জল বাড়ায় ঘাটাল মহাকুমার বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

চন্দ্রকোণার নদীগুলির জলস্তর বিপদসীমা পার করেছে জানিয়ে, ঘাটালের মহকুমাশাসক সুমন বিশ্বাস বলেন, ‘ডিভিসি জল ছাড়ার পরিমাণ আজ কিছুটা কমালেও আগের ছাড়া জল চন্দ্রকোণা হয়ে ঘাটালে নামবে। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু মাটির বাড়ি ভেঙে পড়েছে।’ তিনি এও জানিয়েছেন যে, ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে এবং প্রশাসন সবরকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে এই বন্যা পরিস্থিতির জন্য ডিভিসির জল ছাড়াকেই দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজই বন্যা পরিস্থিতির প্রসঙ্গে DVC-র ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘মাঝরাতে যদি জল ছাড়ে, তাহলে ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ মরে যাবে। এটা পাপ, অন্যায়।’

এই বন্যা পরিস্থিতির জন্য ডিভিসিকেই দায়ী করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু ওদের প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। আসানসোলেও এত বৃষ্টি আগে হয়নি কখনও। পরশু রাত ৩টের সময়ে ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকে আমাদের না জানিয়ে আসানসোলে জল ছেড়়ে দেয়। ফলে আসানসোল, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া পুরো ডুবে গিয়েছে। কালকে আবার ডিভিসি ১ লক্ষ কিউসেকের উপর জল ছেড়েছে।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন যে, ‘ওরা যদি ওদের বাঁধ ও ক্যানালগুলি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, তাহলে অনেক জল ধরতে পারে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে না। ড্রেজিং করে না। মাঞ্চেত, মাইথন, তেনুঘাটে ২ লক্ষ্য কিউসেক মেট্রিক টন আরও ধরতে পারে। ওদের খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে। এটা অন্যায়’। রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতিকে ‘ম্যানমেড’ বলেও উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবেই বলেন, ‘যদি বৃষ্টির জন্য বন্যা হত, তাহলে বুঝতাম। নিঃসন্দেহে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে, আমার সামলাচ্ছি। বন্যাটা কিন্তু হচ্ছে জল ছাড়ার জন্য। মেনম্যাড বন্যা।’ পাশাপাশি এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ত্রাণ তহবিলে দান করার আহ্বান জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।