মৈথিলী চলচ্চিত্র ‘গামক ঘর’-এ উঠে এল শিকড়ের টান ও ‘দেশের বাড়ি’র কথা

Image Source : Google

বংনিউজ২৪x৭ ডেস্কঃ ‘দেশের বাড়ি’ নামে চেনা যায় এক পুঞ্জিভূত স্মৃতির স্থাপত্যকে। যে কোনো মেট্রোপলিটন শহরের অর্ধাংশের বেশি মানুষেরই একটা দেশের বাড়ি থাকে। সরকারি চাকুরেজীবী থেকে পরিযায়ী শ্রমিক নানা পেশার মানুষের ভীড় যে শহরে সেখানে কর্মব্যস্ত মানুষের গভীরে কোথাও লুকিয়ে থাকে শিকড়ের টান একটা দেশের বাড়ির। স্মৃতি রোমন্থিত সে আবেগকে উস্কিয়ে দিয়ে নির্মিত একটি মৈথিলী সিনেমা ‘গামক ঘর’ (GAMAK GHAR)। নির্মাতা একাধারে পরিচালক, প্রযোজক, লেখক, সম্পাদক অচল মিশ্র। ভারতীয় সিনেমায় নতুন মুখ। বিহারের দ্বারভাঙায় জন্ম। এটি তার প্রথম ছবি। যদিও এর আগে মেঘনা গুলজার পরিচালিত হিন্দি ছবি ‘তলোয়ার’ (TALVAR)এ অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন অচল।

‘গামক ঘরে’র আখ্যানগত সময়কাল বিস্তৃত ১৯৯৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত। তিনটি বিশেষ সময়কালকে দেখানো হয়েছে এই সিনেমায় ১৯৯৮, ২০১০, ২০১৯। স্থান বিহারের দ্বারভাঙা জেলার মধুপুর নামক গ্রাম। জন্ম উপলক্ষ্যে আয়োজিত পরিজন-ভোজন অনুষ্ঠান উপলক্ষে সকলে এক জায়গায় মিলিত হয় সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই। সে দৃশ্যে ৯০’এর গ্রাম্য পারিবারিক জীবন ও গ্রাম সংস্কৃতির স্পষ্ট ছবি উঠে আসে। গ্রামের জীবন ভাঙছিল। কাজের সন্ধানে এক একটা পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছিল পাটনা, দিল্লির মতো বড়ো শহরে। ফলে ভাঙছিল একান্নবর্তী পরিবার। এই সিনেমার আখ্যান যে পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে তাদের তিন ভাই এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। বৃদ্ধা মা ২০০৪-এর বন্যার পর কোনো না কোনো ছেলের কাছে থেকে অস্থায়ী জীবন শুরু করে, অতঃপর গ্রামের বাড়ি শূন্য পড়ে থাকে।

২০১০-এর মধ্য পর্যায়ে সিনেমা জীবন বদলের ছবি আঁকে। কত আশা পূর্ণ হয় না, কত দুঃখ নির্বাক থেকে যায়, জীবন কেমন বদলে যেতে থাকে অজানা ভবিষ্যতের বাঁকে বাঁকে। শিশুরা বড়ো হয়, বড়োরা বুড়ো হয়, যে যার ব্যক্তিগত জীবনে মেতে ওঠে, শিকড় আলগা হতে থাকে‌। তবু কোথাও থেকে যায় একটা পিছুটান, শিকড়কে কেন্দ্র করে কিছু আবেগ। এখানে গ্রামের বাড়িই শিকড়ের রূপক। সেই বাড়িকেই ২০১০-এ চড়ানো হয়েছে এক স্তর রঙের প্রলেপ। তা সেই গা-আলগা পরিবার জীবনকে চিহ্নিত করে। শরৎকালের ছটপুজো উপলক্ষ্যে একত্রিত হওয়া ২০১০-এ ঘটনাক্রমে।

২০১৯-এ গৃহ শূন্য। কেউ আর আসে না বহুদিন। সবুজ শ্যাওলা আর দেওয়ালে শিকড় গজিয়ে ফাটল ধরানো গাছ, ভাঙা জানালা। বাড়ি মেরামতের জন্য যখন ভাঙা হয়, একটা একটা করে খোলার চাল ছাড়ানো হতে থাকে, একটা একটা ইট খসে পড়তে থাকে, যেন সত্তার ভাঙন এ ছবি। তবু তাকে মেরামত করার চেষ্টা করে বাড়ির তৃতীয় প্রজন্মের বড়ো ছেলে। কেননা সবাই আবার একটা জন্মকে উপলক্ষ্য করে একত্রিত হতে চায়। শেষে ভাঙা বাড়ি থেকেই সে আলাদা করে নেয় তার দাদুর ছবিটি। এটিও শিকড়ের পিছুটান চিহ্নিত করে। যা কোথাও কোথাও থেকে যায়।

তিনটি সময়পটের শেষ দৃশ্যগুলো সাংকেতিক, ছেলেরা সবাই চলে গেলে একলা বৃদ্ধার জানলা-দরজা বন্ধ করা আর ঝেঁপে বৃষ্টি আসা, মেঝেয় ঘুঘুর বিচরণ আর শেষ দৃশ্যে ইটের খসে পড়া। চূড়ান্ত স্মৃতি কাতরতা দিয়ে যায় এই সকল দৃশ্য, এর সঙ্গে আবহ সংগীত এবং পরিবেশের মায়াজাল।

২০১৯-এ মুম্বাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মনীষ আচার্য পুরস্কার লাভ করে এই সিনেমাটি, ভারতীয় সিনেমায় নতুন স্বরের জন্য। সেখানেই প্রথম সিনেমাটি প্রর্দশিত হয়। ভারতের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বাস্তবতায় এই সিনেমাটি স্পর্শ করে যায় ভারতীয় মনকে। অন্যান্য ভারতীয়ের মতোই বহু বাঙালির ‘দেশের বাড়ি’ জড়িয়ে থাকে এই সিনেমাজুড়ে।

আরও পড়ুনঃ  সোনা দিয়ে মাস্ক হতে পারে, তা বলে সোনার পাতে মোড়ানো আস্ত একখানা হোটেল?

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন.