লড়াই শেষ! চলে গেলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম

লড়াই শেষ! চলে গেলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম
লড়াই শেষ! চলে গেলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম

বংনিউজ২৪x৭ বিনোদন ডেস্কঃ লড়াই শেষ। করোনাকে হারালেও, শেষরক্ষা হল না। চলে গেলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম। সেই সঙ্গে অবসান হল সঙ্গীতের একটা যুগের। চেন্নাইয়ের হাসপাতালে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। শুক্রবার বেলা ১ টা বেজে ৪ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীত জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী সাবিত্রী, ছেলে চরণ ও মেয়ে পল্লবী’কে।

জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী এসপি বালাসুব্রাহ্মণ্যম করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৫ আগস্ট চেন্নাইয়ের এমজিএম হেলথ কেয়ার, বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও শেয়ার করে তাঁর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে এনেছিলেন।

উল্লেখ্য, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর, সেখান থেকে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় এই বিশিষ্ট গায়ক জানিয়েছিলেন যে, কয়েকদিন ধরে তাঁর জ্বর এবং সর্দিকাশি হয়েছিল। এরপরই তিনি করোনা পরীক্ষা করান, সেই পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। চিকিৎসক তাঁকে বাড়িতেই কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। উপসর্গ মৃদু হওয়ার কারণে। কিন্তু ৭৪ বছর বয়সী এই গায়ক নিজের এবং পরিবারের জন্য কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি, তাই চেন্নাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

তিনি আরও জানিয়েছিলেন যে, তিনি ভাল আছেন এবং হাসপাতালের চিকিৎসক এবং কর্মীরা যথেষ্ট যত্ন এবং সহযোগিতা করছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, খুব শীঘ্রই তিনি করোনাকে হারিয়ে, সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। তিনি তাঁর সকল অনুরাগী, বন্ধুবান্ধব এবং আপনজনদের উদ্দেশ্যে এও বলেছিলেন যে, চিন্তা করার কোন কারণ নেই, তাঁর সঙ্গে দেখা বা ফোন করার প্রয়োজনও নেই। বিশ্রামে থাকতে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী।

করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাননি। মাঝে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও, পরে ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরই মধ্যে ১৩ সেপ্টেম্বর, তাঁর করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। কিন্তু তার পরেও শারীরিক অবস্থার কোনওরকম উন্নতি হচ্ছিল না। ফুসফুসের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেটর থেকেও বার করা যায়নি।

এদিকে গত ২২ সেপ্টেম্বরই এসপি বালাসুহ্মণ্যম-এর ছেলে এসপি চরণ ট্যুইট করে জানিয়েছিলেন, শিল্পীর অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। চলছে ফিজিওথেরাপি। জলও খেতে পারছেন। হাসপাতাল ছেড়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতে চান তিনি। কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হল না, কিংবদন্তি এই সঙ্গীতশিল্পীর।

এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার ফের অবনতি হতে শুরু করে। হাসপাতাল থেকে জানানো হয় যে, তাঁকে সর্বোচ্চ লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। ওইদিনই হাসপাতালের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘এসপি বালাসুহ্মণ্যমকে এমজিএম হেলথকেয়ারে গত ৫ অগস্ট ভর্তি করা হয়েছিল। এখনও তাঁকে ইসিএমও-তেই রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি লাইফ সাপোর্টও।’ এরপর গত ২৪ ঘন্টায় তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হয়। তিনি অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতিতে রয়েছেন বলে জানানো হয়। অবশেষে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন এসপি বালাসুহ্মণ্যম।

শুক্রবার তাঁর মৃত্যুর খবর জানিয়ে তাঁর ছেলে চরণ জানান যে, ‘আমার বাবা আজ দুপুর ১.০৪ মিনিটে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আপনাদের সকলের প্রার্থনার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার বাবা তাঁর অনুরাগীদের স্মৃতির মধ্যে চিরকাল জীবিত থাকবেন।’

সুদীর্ঘ সংগীতজীবনে, পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরেও এসপি বালাসুহ্মণ্যম বিভিন্ন ভাষায় সংগীত পরিবেশন করেছেন। চলচ্চিত্রে নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি দক্ষিণের পাশাপাশি বলিউডেও জনপ্রিয়। হিন্দি, তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়লাম সহ ১৫ টি ভাষায় অগণিত সুপারহিট গানে কণ্ঠ দিয়েছেন এই প্রবীণ শিল্পী। ৪০,০০০ হাজারেরও বেশি গান তিনি গেয়েছেন বিভিন্ন ভাষায়। কোনওরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি সংগীত পরিবেশন করে অজস্র দর্শকের মুগ্ধ করেছেন। সংগীত শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন অভিনেতা, সংগীত পরিচালক, ডাবিং আর্টিস্টও। সর্বাধিক গান রেকর্ড করার জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তাঁর নামও আছে। তিনি পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

সুরের জাদুতে ভুলিয়ে রেখেছিলেন আসমুদ্রহিমাচলের সমস্ত সঙ্গীতপ্রেমী মানুষকে। সিনেমায় নেপথ্য গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া, তেলুগু ছবু ‘শ্রী শ্রী মর্যাদা রামান্না’র হাত ধরে। এরপর শুধুই সাফল্য আর সাফল্য। পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দক্ষিণী ভাষার পাশাপাশি হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গান আজও মানুষকে একই রকমভাবে মুগ্ধ করে। বলিউডে তাঁর গাওয়া চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া, হাম আপকে হ্যায় কৌন, রোজা’র মতো সুপারহিট চলচ্চিত্র। গায়কের ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি, তাঁর অভিনয়ও দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

অনুরাগীদের শোকস্তব্ধ করে ইহজগতকে বিদায় জানিয়ে যাত্রা করলেন অমৃতলোকের পথে, কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী এসপি বালাসুহ্মণ্যম। রেখে গেলেন একরাশ সুরেলা স্মৃতি। শিল্পীর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন দেশের বিনোদন জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।

সঙ্গীত সাম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ‘প্রতিভাশালী গায়ক, মধুরভাষী, একজন সৎ মানুষ এসপি বালাসুহ্মণ্যম-এর স্বর্গবাসের খবর শুনে আমি খুবই ব্যথিত। আমরা একসঙ্গে অনেক গান গেয়েছি। সব কথা মনে পড়ছে। ঈশ্বর তাঁর আত্মার শান্তি দিক। অনার পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা রইল।’

এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ায় শোক জ্ঞাপন করেছেন হেমা মালিনী, জনি লিভার, অক্ষয় কুমার, মহেশ বাবু, শ্রুতি হাসান-সহ অনেকেই।

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন.