বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০২২

বিজ্ঞাপনের কাজ, প্রচ্ছদ আঁকা থেকে কিংবদন্তি পরিচালক! প্রয়াণদিবসে ফিরে দেখা সত্যজিৎ-কে

মৌসুমী মোদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২২, ০৫:৫৫ পিএম | আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০২২, ০৫:৫৯ পিএম

বিজ্ঞাপনের কাজ, প্রচ্ছদ আঁকা থেকে কিংবদন্তি পরিচালক! প্রয়াণদিবসে ফিরে দেখা সত্যজিৎ-কে
বিজ্ঞাপনের কাজ, প্রচ্ছদ আঁকা থেকে কিংবদন্তি পরিচালক! প্রয়াণদিবসে ফিরে দেখা সত্যজিৎ-কে

২৩ এপ্রিল, বাঙালির কাছে অত্যন্ত শোকের দিন। কারণ, এদিনই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরলোকে পাড়ি দেন কিংবদন্তি বাঙালি পরিচালক তথা সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল প্রয়াত হন বিশ্ববন্দিত এই ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে আলোকচিত্রী, চিত্রকর, সাহিত্যিক ও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। সত্যজিৎ রায় ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ কার্যত অসম্পূর্ণ।

সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালের ২ মে। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা। উনিশ শতকের শেষভাগে সেই দেশ ছেড়ে সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ১০০, গড়পার রোডের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এই বাড়িতেই জন্ম সত্যজিতের।

৯ বছর বয়সে প্রথম স্কুলে পা রাখেন সত্যজিৎ রায়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে পাশ করে বেরোনোর পর ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। আর কলেজের গণ্ডী পেরোনোর পর মা সুপ্রভা রায়ের ইচ্ছেতে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ছবি আঁকতে বরাবরই ভাল পারতেন সত্যজিৎ। স্কুলের আঁকার শিক্ষকের প্রিয়পাত্রও ছিলেন। কিন্তু প্রথাগতভাবে কোনওদিনই আঁকা শেখেননি। শান্তিনিকেতনে গিয়ে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছেই শিল্পক্ষেত্রে হাতযশ খুলতে শুরু করে সত্যজিতের।

১৯৪৩ সালে প্রথম চাকরি পান সত্যজিৎ রায়। নামী ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ভিস্যুয়ালাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গতে বাঁধা চাকরি ছিল তাঁর একেবারেই না-পসন্দ! এভাবে কাজ করতে করতে একসময় সিগনেট প্রেসের চাকরি পেতেই তাঁর সামনে খুলে যায় নতুন দরজা । সেখানে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার কাজ পান তিনি৷

প্রচ্ছদ আঁকার কাজ করতে করতেই একদিন ‘আম আঁটির ভেঁপু’র স্কেচ করার কাজ আসে সত্যজিতের হাতে। আর সেই গল্প পড়েই তাঁর মনে জাগে মূল উপন্যাসটি নিয়ে কাজ করার সাধ। ব্যাস! শুরু করলেন চিত্রনাট্য লেখা। কিন্তু সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণ শেষ করতে সময় লেগে গেল প্রায় তিন বছর। এই সিনেমা নির্মাণের টাকা-পয়সার জোগার করতে হিমশিম খেতে হয়। একসময় আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষে তিনি হাত পাতেন বেঙ্গল গভর্নমেন্টের কাছে। সরকারি ঋণের অর্থে সিনেমার বাকি কাজ শেষ হয়।

অবশেষে ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ তার স্বপ্নের সিনেমা ‍‍`পথের পাঁচালি‍‍`! তারপর বাকিটা শুধুই ইতিহাস। দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়ার পাশাপাশি এই ছবি আর্থিকভাবেও সফল হয়। কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্টারি হিসেবে পুরস্কৃত হওয়া সহ ১১টি আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পায় ছবিটি। এরপরের ছবি ‘অপরাজিত’ সত্যজিৎ রায়কে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। ছবিটি ইতালির ভেনিসের বিখ্যাত গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার লাভ করে।

এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেন  ‘অপুর সংসার’, ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘চারুলতা’, ‘দেবী’, ‘মহানগর’, ‘অভিযান’, ‘কাপুরুষ’, ‘মহাপুরুষ’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জনারণ্য’, ‘হীরক রাজার দেশ’, ‘গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’, ‘আগন্তক’, ‍‍`ঘরে ও বাইরে‍‍`। ডকুমেন্টারি ফিল্ম, শর্ট ফিল্ম, ফিচার ফিল্মসহ সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেন মোট ৩৭ টি ছবি। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন ছিলেন তিনি।

১৯৯২ সালে দ্যা অ্যাকাডেমি অব মোশান পিকচার আর্টস অ্যান্ড সাইন্স সত্যজিৎকে সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করে।  উপমহাদেশের প্রথম নির্মাতা হিসেবে অস্কার পান তিনি। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা। সেই ১৯৯২ সালেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সত্যজিৎ রায়। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের বেডেই কাটে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি। এরপর ২৩ এপ্রিল তিনি পাড়ি দেন না ফেরার দেশে।