চিকিৎসার পাশাপাশি পুরোদমে চলত সাহিত্য চর্চাও! জন্মদিবসে ছোটগল্পের জাদুকর ‘বনফুল’কে শ্রদ্ধার্ঘ্য

চিকিৎসার পাশাপাশি পুরোদমে চলত সাহিত্য চর্চাও! জন্মদিবসে ছোটগল্পের জাদুকর 'বনফুল'কে শ্রদ্ধার্ঘ্য
চিকিৎসার পাশাপাশি পুরোদমে চলত সাহিত্য চর্চাও! জন্মদিবসে ছোটগল্পের জাদুকর 'বনফুল'কে শ্রদ্ধার্ঘ্য

তাঁকে বলা হতো বাংলা ছোটগল্পের জাদুকর৷ পেশায় চিকিৎসক হলেও নেশা ছিল সাহিত্যচর্চা। সমাজের অবহেলিত মানুষের সেবা করা ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। চিকিৎসক হিসেবে শুধুমাত্র সেবাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। বরং সমাজের সাধারণ, নিরন্ন, অবহেলিত, শ্রমজীবী মানুষের জীবন আঁকতে চেয়েছিলেন নিজের লেখনীতে। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্য জগতের অন্যতম কিংবদন্তি লেখক। তিনি কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রবন্ধকার বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। ছদ্মনাম ‘বনফুল’। আজ তাঁর জন্মদিবসে রইল শ্রদ্ধার্ঘ্য…

১৮৯৯ সালের ১৯ জুলাই বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই সাহিত্যিক। পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার শিয়াখালায়। পিতা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসক। মায়ের নাম মৃণালিনী দেবী গৃহবধূ। বনফুলের শিক্ষাজীবনের শুরু মণিহারী স্কুলে। পরে সাহেবগঞ্জ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে ১৯১৮ সালে প্রবেশিকা (এন্ট্রান্স) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২০ সালে তিনি হাজারীবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

এরপর পাটনা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে কর্মজীবন শুরু করেন কলকাতার একটি বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে। পরে মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জের মিউনিসিপ্যালিটি হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার পদে থাকার পর ভাগলপুরের খলিফাবাগে নিজ উদ্যোগে The Secro-Bactro Clinic নামে একটি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন বনফুল। এখান থেকেই তিনি খ্যাতিমান ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

ছোটবেলা থেকেই বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ। স্কুলে পড়ার সময়ই বনফুলের সাহিত্য জীবনের শুরু। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে সাহেবগঞ্জ স্কুল থেকে প্রকাশিত ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায় ‘বনফুল’ ছদ্মনামে কবিতা রচনা করেন। এছাড়াও সম্পাদনা করেন বিকাশ নামে হাতে-লেখা একটি সাহিত্য পত্রিকা। এ সময় থেকেই ভারতী, প্রবাসী, কল্লোল প্রভৃৃতি বিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর সাহিত্য। এরপর চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনের পাশাপাশিই সাহিত্য চর্চাও হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

সাহিত্য সাধনায় বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব প্রকাশ করতে শব্দই যেন কম পড়ে যাবে। তাঁর লেখনীতে প্রকাশ পেত মানবজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতি। ছোটগল্প রচনায় দারুণ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বনফুল। তাঁর গল্পের বিশেষত্ব হচ্ছে স্বল্প অবয়ব। অল্প কথায় গল্প শেষ। কিন্তু তার রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ। বনফুল সহস্রাধিক কবিতা, ৫৮৬টি ছোট গল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক, জীবনী ছাড়াও অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু গল্পগ্রন্থ- বনফুলের গল্প, বিন্দুবিসর্গ, অদৃশ্যলোকে, তন্বী, অনুগামিনী, দূরবীণ, মণিহারী, বহুবর্ণ, বনফুলের নতুন গল্প প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস— তৃণখণ্ড, জঙ্গম, অগ্নি, ডানা, স্থাবর, অগ্নীশ্বর, হাটেবাজারে, ত্রিবর্ণ, ভুবনসোম, প্রচ্ছন্ন মহিমা, উদয় অস্ত প্রভৃতি। দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লেখা তাঁর নাটক- শ্রীমধুসূদন ও বিদ্যাসাগর। তাঁর কয়েকটি উপন্যাস এবং একাধিক ছোটগল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে খ্যাতনামা কিছু চলচ্চিত্রও।

সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিতে বহু পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। শরৎস্মৃতি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, জগত্তারিণী পদক লাভ করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৭৫ সালে ভারত সরকার বনফুলকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে। এই মহান সাহিত্যিক ১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এই পৃথিবী ছেড়ে পরলোকে পাড়ি দেন। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে রইল সশ্রদ্ধ প্রণাম।