শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

বাবা গ্যাস মিস্ত্রি, মেয়ের মেধার কাছে হার দারিদ্রের! NEET-এ দুর্দান্ত ফল করে AIIMS-এ দুর্গাপুরের সরস্বতী

মৌসুমী মোদক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৫, ২০২২, ০৯:৪৪ পিএম | আপডেট: ডিসেম্বর ৫, ২০২২, ০৯:৪৪ পিএম

বাবা গ্যাস মিস্ত্রি, মেয়ের মেধার কাছে হার দারিদ্রের! NEET-এ দুর্দান্ত ফল করে AIIMS-এ দুর্গাপুরের সরস্বতী
বাবা গ্যাস মিস্ত্রি, মেয়ের মেধার কাছে হার দারিদ্রের! NEET-এ দুর্দান্ত ফল করে AIIMS-এ দুর্গাপুরের সরস্বতী

বাবা পেশায় গ্যাস মিস্ত্রি। মা গৃহবধূ। কিন্তু মেয়ের মেধার কাছে হার মানল দারিদ্র৷ সর্বভারতীয় মেডিক্যাল পরীক্ষায় চোখ ধাঁধানো র‍্যাঙ্ক করে আপাতত দিল্লি AIIMS-এ পড়াশোনা পেলেন মেয়ে। আর তার এই সাফল্যে চোখে জল বাবা-মায়ের। গর্বে বুক ফুলে উঠেছে তাদেরও।

দুর্গাপুরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের দেশবন্ধু নগর কলোনির বাসিন্দা সরস্বতী রজক। ছোটবেলা থেকে অভাব দেখে এসেছেন এই মেয়ে। বাবা পেশায় গ্যাস মিস্ত্রি। বাড়ি বাড়ি গ্যাস ওভেন সারিয়ে বেড়ান নিত্যানন্দ রজক। অ্যাজবেস্টরের ছাউনি দেওয়া বাড়িতে এখনও রান্না হয় কাঠের উনুনে। জন্ম থেকেই দারিদ্রকে কাছে থেকে দেখেছেন সরস্বতী। কিন্তু মেয়েটা কখনও জেদ ছাড়েনি পড়াশোনার। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছে নিজের লক্ষ্যে

স্থানীয় শিশু শিক্ষা কেন্দ্র থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ হয় তাঁর। এরপর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সায়েন্স নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা সরস্বতীর। ছেলেবেলা থেকেই বাবাকে সংগ্রাম করতে দেখেছেন তিনি। পেশায় গ্যাস মিস্ত্রি বাবার নুন আনতে পান্তা ফোরানোর জোগাড়। কিন্তু, মেয়ের পড়াশোনায় যাতে কোনও ব্যাখাত না ঘটে সেজন্য দিতেন বিশেষ নজর। খাতা, বই থেকে শুরু করে ভালো ফলাফল করার জন্য মেয়ের যা যা প্রয়োজন হয়েছে নিজের সামর্থ্য দিয়ে পুরোটাই জোগান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

উচ্চমাধ্যমিকের পর রানিগঞ্জের ত্রিবেণীদেবী ভালোটিয়া কলেজে থেকে পড়াশোনা করছিলেন সরস্বতী। কিন্তু, ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তাই কলেজে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু করেছিলেন NEET-এর প্রস্তুতিও। একদিকে সংসারের অভাব অন্যদিকে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার চাপ, কিন্তু পথভ্রষ্ট হননি সরস্বতী।

২০২২ সালে নিট পরীক্ষা দেন তিনি এবং সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। সরস্বতী জানান , এর আগেও নিট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, সেই সময় র‌্যাঙ্ক ভালো না হওয়ায় রায়পুর মেডিক্যাল কলেজে চান্স পান তিনি। সেখানে ১২ লাখ টাকা চাওয়া হয় তাঁর থেকে। কিন্তু, সেই টাকা দেওয়ার মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল না। এরপরেই এই কিশোরী জেদ ধরেন সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনার জন্য ভালো র‌্যাঙ্ক করবেন তিনি, যাতে পরিবারকে কোনও অর্থ দিতে না হয়।

সরস্বতী বলেন, নিটে বসার জন্য পড়াশোনা সবটাই করেছিলাম বাড়িতে বসে। ব়্যাঙ্ক হয়েছিল এক লাখেরও বেশি। সেইসময় ওএমআর শিটের কিছু জানতাম না।  বহু মার্কিং সার্কেলের বাইরে হয়ে গিয়েছিল। ফলে বহু নম্বর কাটা যায়। তবে শেষপর্যন্ত চান্স পেয়েছিলাম রাইপুর মেডিক্যাল কলেজে। কিন্তু ভর্তির জন্য আমার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা চাওয়া হয়। সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ আমার ছিল না। তবে বাড়ি থেকে ওই টাকা দেওয়ার ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জেদ ধরেছিলাম ফের পরীক্ষা দেব। ফের পড়াশোনা শুরু করি। ২০২২ এ ফের নিটে দিয়ে ৬ হাজারের বেশি ব়্যাঙ্ক হয়েছে। এবার আমি এইমসে ভর্তি হতে পারব। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা আমাকে দেখান আমার ছোট মামা। এইচএস-এ আমার দিদা বিনা চিকিত্সায় মারা যায়। ওকে খুব ভালোবাসতাম। ঠিক করে ফেলি ডাক্তারই হব।

আপাতত তিনি দিল্লি AIIMS-এ ভর্তি হয়েছেন। প্রতিবেশীরাও আজ গর্বিত। সরস্বতীকে দেখে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবেন বলেও মন্তব্য তাঁদের। দুর্গাপুরের দেশবন্ধু নগরের এই তরুণীকে নিয়ে এখন হইচই পড়ে গিয়েছে এলাকায়।