মোট ৯ বার চিন সফরকারি মোদির কূটনতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন

মোট ৯ বার চিন সফরকারি মোদির কূটনতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন
মোট ৯ বার চিন সফরকারি মোদির কূটনতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন

লাদাখে চিন-ভারত সংঘর্ষের পর তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে বা মিত্র দেশগুলি বা ভারতের কোনও বন্ধু ভারতের পক্ষে বিবৃতি দেয়নি। এমনকি ৪ জুন মোদি এবং অস্ট্রেলিয়ার নেতা স্কট মরিসনের মধ্যে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনের পর যৌথ বিবৃতিতেও লাদাখের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

মহামারী শুরু হওয়ার আগে থেকেই আমেরিকা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। সেদেশে সাধারণ ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২৫% এবং ওয়াল স্ট্রিটের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে এটি জিডিপির ২০০০% এ পৌঁছতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের ঘাটতির সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন শীঘ্রই ডলারের পতনের একটি কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই চিনের সঙ্গে আরও ভাল বাণিজ্য চুক্তি চায়। আগামী নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে, এই চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। করোনা ভাইরাস-উত্তর পৃথিবীতে বৈশ্বিক শক্তির নতুন বিন্যাসে চিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাতে ভারতের লাভ হবে-এমন হিসাব অবাস্তব বলে মনে হয়।

মোদির একটি অলীক আশা রয়েছে যে, মহামারীর পরে ভারত দ্রুত এবং অপ্রতিহত গতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, মহামারী-উত্তর বিশ্বে সরবরাহ চেন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। তিনি এ ব্যাপারেও আশাবাদী যে,আমেরিকা,অস্ট্রেলিয়া এবং অনেক ইউরোপীয় দেশ তাদের অর্থনীতি থেকে চিনকে বিচ্ছিন্ন করবে। তারা ভারতকে অংশীদার ও মিত্র হিসেবে চাইবে। তাদের কারখানাগুলো স্থানান্তরিত হবে এবং ভারত হয়ে উঠবে একটি নতুন গন্তব্য।

মহামারীর আগে, ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকায় ইতিবাচক ছিল। এবং মোদির লক্ষ্য হল আমেরিকা ও ইইউ–এর যে সব সংস্থাকে প্রধান মিত্র বানানো যারা চিন থেকে ভারতে স্থানান্তরিত হবে।

মার্কিন সংস্থাগুলো যে ভারতে স্থানান্তরিত হবেই, তেমন কোনও নিশ্চয়তা নেই, কারণ ২০১৮ সালের মার্চ মাসে মার্কিন-চিন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ৫% এরও কম সংস্থা ভারতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এবং তারা স্থানান্তরিত হলেও, এটি ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশের নিশ্চয়তা দেয় না, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যগুলোর কার্যকর চাহিদা কয়েক বছরে বেড়ে যাবার তেমন সম্ভাবনা নেই।

‘আত্মনির্ভর ভারত’ গড়ার ধারণা থেকে মোদি গত ১২ মে মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ২৬০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। বেইজিং বুঝতে পেরেছিল যে মোদির অভিপ্রায় চিনা পণ্য ঠেকানো। একইসঙ্গে চিন থেকে স্থানান্তরিত করতে চায় এমন আমেরিকান সংস্থাগুলোতে ভারতে স্বাগত জানানো।

চিন আমেরিকা থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। দু’দেশের মধ্যে ৩,৪০০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকার কারণে ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে চিনের গভীর উদ্বেগ রয়েছে। চিনা নীতিনির্ধারকরা মনে করেন যে, হিমালয় ও ভারত মহাসাগরে চিনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমেরিকা ভারতকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করছে।

বেইজিং আরও বুঝতে পেরেছে যে ‘দ্য এশিয়ান সেঞ্চুরি’ তৈরির ক্ষেত্রে চিনের সঙ্গে কাজ করার চুক্তি সত্ত্বেও মোদি আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের পরে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ‘একে অপরের সংবেদনশীলতা, উদ্বেগ এবং আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করার গুরুত্ব’ মানতে মোদি নারাজ।

মোদি এবং শি জিনপিং ভারত-চিন সীমানা ইস্যুতে সুষ্ঠু, যুক্তিসঙ্গত এবং পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমঝোতা চাইতে সম্মত হয়েছিলেন। তবে, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পরে, ভারত একটি নতুন মানচিত্র চালু করেছে যাতে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এরপর উচ্ছ্বসিত হয়ে, সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় বক্তব্য রেখে মোদির ডানহাত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন যে, তিনি চিন-শাসিত লাদাখের আকসাই ফিরিয়ে আনবেন। এরপরে জয়শঙ্কর বেইজিংয়ে গিয়ে চিনকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারতের এই অঞ্চল প্রসারিত করার কোনও ইচ্ছা নেই।

চিন প্রাথমিকভাবে এই ঘটনাটিকে ভারতের ঘরোয়া রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে মনে করেছিল। তবে পর পর ঘটে যাওয়া পরবর্তী ঘটনাবলি, যেমন-তাইওয়ানের ইস্যুতে নীতিগত পরিবর্তন, ভারতে চিনের বিনিয়োগকে চেপে ধরা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুনর্গঠন, কোভিড-১৯ নিয়ে তদন্ত, কোয়াড এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি ইত্যাদি বেইজিংয়ের সন্দেহকে বাড়িয়ে তোলে।

আরও পড়ুনঃ  বন্ধ হচ্ছে চিনা বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ আমদানি, তৎপর কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রী

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন.