গত বছরের অতিমারি থেকেই শিক্ষা! দেশের অন্যান্য রাজ্যে যখন আকাল, তখন এই রাজ্যে উদ্বৃত্ত অক্সিজেন

গত বছরের অতিমারি থেকেই শিক্ষা! দেশের অন্যান্য রাজ্যে যখন আকাল, তখন এই রাজ্যে উদ্বৃত্ত অক্সিজেন
গত বছরের অতিমারি থেকেই শিক্ষা! দেশের অন্যান্য রাজ্যে যখন আকাল, তখন এই রাজ্যে উদ্বৃত্ত অক্সিজেন / প্রতীকী ছবি

বংনিউজ২৪x৭ ডিজিটাল ডেস্কঃ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে নাজেহাল গোটা দেশ। দেশের মধ্যে বেশিরভাগ রাজ্যে করোনা ভয়াবহ আকার নিয়েছে এই মুহূর্তে। ঝড়ের গতিতে ছড়াচ্ছে সংক্রমণ। তার সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। গত বছর যখন প্রথম করোনার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তখনও এই পরিমাণে সক্রমণ হয়নি।

তবে এবার পরিস্থিতি অনেকটাই ভয়ঙ্কর। আরও ভয়ঙ্কর হয়েছে মারণ করোনা। দেশের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে সংক্রমণ বেশি হওয়ার কারণে হাসপাতালগুলিতে বেড খালি পাওয়া যাচ্ছে না। তার থেকেও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, অক্সিজেনের অভাব। অক্সিজেনের অভাবে এখনও পর্যন্ত অনেক করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশের অন্যান্য রাজ্যে যখন অক্সিজেনের জন্য হাহাকার পড়েছে। তখন দেশেরই আরেক রাজ্যে আকাল নয়, বরং উদ্বৃত্ত অক্সিজেন। গত বছরের অতিমারি থেকেই শিক্ষা নিয়েছে এই রাজ্য। যা অন্য কোনও রাজ্য নিতে পারেনি। কথা হচ্ছে কেরল প্রসঙ্গে। তাই যখন অন্যান্য রাজ্য অক্সিজেনের জন্য কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল, তখন কেরল অক্সিজেনের জন্য স্বাবলম্বী।

কারণ, গত বছর এপ্রিল মাসে যেখানে কেরলে মেডিক্যাল অক্সিজেন উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৯৯.৩৯ মেট্রিক টন, সেখানে এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ২১৯ মেট্রিক টন৷ গত বছর যখন প্রথম করোনা তার মারণ থাবা বসায় দেশজুড়ে, তখন কেরলও আক্রান্ত হয়েছিল। সেই সময়ই কেরল সরকার বুঝতে পেরেছিল যে, আবারও ভবিষ্যতে এই সংকট ফিরে আসতে পারে। তাই চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত অক্সিজেনের সংকটও দেখা দিতে পারে স্বাভাবিকভাবেই।

সেই ভাবনা থেকেই, মেডিক্যাল অক্সিজেনের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং  তা মজুত করার পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করেছিল দক্ষিণের এই রাজ্যটি৷ উল্লেখ্য, গত বছর কেরলে প্রতি মিনিটে অক্সিজেন উৎপাদন হত ৫০ লিটার করে৷ বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে প্রতি মিনিটে ১২৫০ লিটার৷ গত বছরের ২৩ মার্চ থেকে কেরলের স্বাস্থ্য দফতর এবং গোটা দেশে অক্সিজেন সরবরাহের পরিস্থিতির উপরে নজর রাখা কেন্দ্রীয় এজেন্সি PESO-র পরিকল্পনার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে৷

পেসো-র ডেপুটি চিফ কন্ট্রোলার আর বেণুগোপাল জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং যথাযথ পদক্ষেপের ফলেই এই সুফল পাওয়া গিয়েছে৷ তিনি আরও জানিয়েছেন যে, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্সি এবং রাজ্য সরকারের যৌথ প্রচেষ্টাতেই এমন অসাধারণ ফল পাওয়া সম্ভব৷ যাতে রোগীদের অক্সিজেনের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়৷ কীভাবে অক্সিজেন উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়, দু’ তরফই প্রতিনিয়ত সেই পথ খোঁজার চেষ্টা করে গিয়েছে৷ বিপিসিএল-এর কোচি পরিশোধনাগার থেকেই করোনার সময় যখন অক্সিজেনের চাহিদা তুঙ্গে ছিল, তখন ২ মেট্রিক টন পর্যন্ত অক্সিজেন পাওয়া গিয়েছে৷ এবারেও তারা কেরলের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য তৈরি৷’

অন্যদিকে জানা গিয়েছে, একইভাবে পালাক্কাড়ে আইনক্স প্ল্যান্টের ১৪৯ মেট্রিক টন অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে৷ কেরল মিনারেলস অ্যান্ড মেটালস লিমিটেড গত নভেম্বর মাস থেকে অক্সিজেন উৎপাদন করছে৷ সেখান থেকেও ৭ মেট্রিক টন অক্সিজেন পায় কেরল৷

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেন, ‘আমরা কেরলের চিকিৎসা ক্ষেত্রের পরিকাঠামো অনেকটাই বাড়িয়ে নিতে পেরেছি৷ এই মুহূর্তে আমাদের রাজ্যে অক্সিজেনের চাহিদা ৭৪.২৫ মেট্রিক টন৷ আর আমরা ২১৯.২২ মেট্রিক টন অক্সিজেন উৎপাদন করছি৷ সব সরকারি হাসপাতালে কোভিড এবং সাধারণ রোগীদের জন্য মোট যে আইসিইউ বেড আছে, তার ৫০ শতাংশই এখনও খালি রয়েছে৷’

গত বছরের জুন মাস থেকেই রাজ্যে দৈনিক অক্সিজেনের গড় চাহিদা কত, তা হিসেব করেছে কেরল প্রশাসন৷ জানা গিয়েছে, প্রতি হাসপাতাল পিছু এই হিসেব করা হয়েছে৷ আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যে ১০৩.৫১ মেট্রিক টন অক্সিজেন লাগতে পারে বলে হিসেব করা হয়েছে৷ তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অক্সিজেন এই মুহূর্তে মজুত রয়েছে কেরল সরকারের হাতে৷

জানা গিয়েছে যে, এই ব্যাপারে পেসো, কেরল মেডিক্যাল সার্ভিস কর্পোরেশন, বিভিন্ন হাসপাতাল এবং অক্সিজেন সরবাহের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির মধ্যে নিয়মিত বৈঠকও হয়৷ বর্তমানে কেরলের ৩২টি হাসপাতালে ২ থেকে ৩০ মেট্রিক টন অক্সিজেন একসঙ্গে মজুত করে রাখার পরিকাঠামো রয়েছে৷ জরুরি প্রয়োজনে কোচিন শিপইয়ার্ড থেকেও অক্সিজেন পাওয়া সম্ভব৷ সেখানেও ২০ মেট্রিক টন অক্সিজেন উৎপাদিত হয়৷

আর সেই জন্যই গত দু’ তিন দিনে অক্সিজেনের চাহিদা কিছুটা বাড়লেও বড় ধরনের কোনও সমস্যায় পড়েনি কেরল। যে সমস্যা দেখা দিয়েছে এখন অন্যান্য রাজ্যে। বরং উল্টে কেরল থেকেই তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে৷ ইতিমধ্যেই দক্ষিণের এই রাজ্য থেকে ২০ হাজার লিটার অক্সিজেন পেয়ে, কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন গোয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্বজিৎ রানে৷

তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশে যখন অক্সিজেন সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে, অক্সিজেনের অভাবে করোনা রোগীর মৃত্যু হচ্ছে, অক্সিজেনের জন্য তারা যখন কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল, ঠিক তখনই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে, পথ দেখাল সেই কেরল৷