কোভিড যোদ্ধা! ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি

কোভিড যোদ্ধা! 'ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস'-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র
কোভিড যোদ্ধা! 'ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস'-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র

আজকের নারী, চালায় টোটোগাড়ি
শিলিগুড়িতে থাকি,
শক্তিগড় আমার বাড়ি
দেখুন আমরাও পারি…

পেশায় তিনি এক টোটোচালিকা। তাঁরই টোটোর ওপরে লেখা উপরিউক্ত কথাগুলি। তবে শুধু টোটোচালিকা বললে ভুল হবে। তিনি শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা। যিনি ইতিমধ্যেই ‘কোভিড যোদ্ধা’ হিসাবে পরিচিত দেশের দরবারে। স্বয়ং উপরাষ্ট্রপতি তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ! আসন্ন নারীদিবসের প্রাক্কালে জেনে নেওয়া যাক সেই মহিয়সী নারীর কাহিনী। যিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেই মেতে রয়েছেন সমাজের সেবায়৷ গড়েছেন নিজস্ব নারীসত্ত্বার পরিচয়…

শিলিগুড়ির শক্তিগড়ের বাসিন্দা মুনমুন সরকার। টোটো নিয়ে পথে বেরোনো রুজি রোজগারের টানেই। ২০১২ সালে টোটো নিয়ে প্রথম পথে নামেন তিনি। সেসময় শিলিগুড়ির একমাত্র মহিলা টোটোচালিকা ছিলেন মুনমুন। এরপর তাঁকে দেখেই এগিয়ে আসেন আরও বহু নারী। তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সকলের অনুপ্রেরণা।

কোভিড যোদ্ধা! 'ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস'-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র
কোভিড যোদ্ধা! ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র

কিন্তু এরকম তো কতই হয়! তবে? নাহ! শুধু টোটোচালিকা হিসাবেই থেমে থাকেননি মুনমুন। পাশাপাশি শুরু করলেন সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডও। নিজের টোটোকে বানালেন তার সারথি। শিলিগুড়ির বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের টোটোতে চাপিয়ে পুজো দেখানোই হোক, বা যে কোনও দরকারে তাঁদের পাশে থাকা, সবেতেই সমান স্বচ্ছন্দে কাজ করে গিয়েছেন মুনমুন। পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য সামাজিক কাজ কর্মেও মানুষ পাশে পেতেন তাঁকে। যে কোনও জায়গায় রক্তদান হচ্ছে শুনলেই ছুটে যেতেন তিনি। সঙ্গে টোটোতে চাপিয়ে নিয়ে যেতেন বাড়তি ডোনারও। মানুষের মধ্যে রক্ত নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতেও তাঁর জুড়ি মেলা ছিল ভার। এভাবেই তিনি মুনমুন থেকে হয়ে উঠলেন সবার প্রিয় মুনিয়া দিদি।

তবে এসবের মাঝেই গত বছরের করোনাকালীন পরিস্থিতিতে তাঁর অবদান ছাপিয়ে গিয়েছে সব কিছুকেই। গত বছরে করোনা পরিস্থিতিতে তখন দেশ জুড়ে লকডাউন। বন্ধ যান চলাচল। মুনিয়া দিদির টোটোও তখন ঘরবন্দী। এদিকে অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে তখন হাসপাতালে যেতে পারছেন না আক্রান্তরা। পাশে এসে দাঁড়ালেন মুনমুন ওরফে মুনিয়া দিদি। নিজের উদ্যোগে যোগাড় করে ফেললেন পিপিই কিট। তারপর সেই টোটোতে করেই আক্রান্ত দের পৌঁছে দিতে থাকলেন হাসপাতালে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই। এভাবে মোট ৯৭৮ জন আক্রান্তের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

কোভিড যোদ্ধা! 'ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস'-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র
কোভিড যোদ্ধা! ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র

তবে সব কিছু এত সহজে হয়নি। করোনা আক্রান্তদের বহন করার জন্য প্রথম প্রথম তাঁর সঙ্গে কথা বলতেও ভয় পেত সবাই। এমনকি নিজের পাড়াতেও ঢুকতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তবে তিনি দমে যাননি। পিছিয়ে আসেননি একটি পাও। বরং নিজের অদম্য ইচ্ছা শক্তির ওপর ভর করেই মানুষের সেবায় এগিয়ে গিয়েছেন বারবার। পাশে দাঁড়িয়েছেন সাহায্যপ্রার্থীদের।
তাঁর এই নিঃস্বার্থ সেবার জন্য ইতিমধ্যেই ‘কোভিড যোদ্ধা’র শিরোপা পেয়েছেন মুনমুন। নাম উঠেছে ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এর পাতাতেও। শুধু তাই নয়, তাঁর কাজের প্রশংসা করে ট্যুইট করেন স্বয়ং দেশের উপ-রাষ্ট্রপতিও। সিকিমের রাজ্যপালও তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পেয়েছেন আর্থিক সাহায্যও। এছাড়াও আরও কত-শত পুরস্কার। এই সবই তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রসারে সাহায্য করেছে পরোক্ষভাবে।

কোভিড যোদ্ধা! 'ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস'-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র
কোভিড যোদ্ধা! ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ নাম তুললেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালিকা মুনিয়া দিদি / নিজস্ব চিত্র

এরপরও থেমে থাকতে চান না এই সাহসী টোটোচালিকা। নিজের চেষ্টায় তিনি ইতিমধ্যেই গড়ে ফেলেছেন একটি এনজিও। নাম, স্বদিচ্ছা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। এনজিওটির উদ্দেশ্য একটাই, সমাজের নারীদের অধিকারের সমান বন্টনের প্রচেষ্টা। পাশাপাশি সামাজিক নানা কাজেও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর নারীদের এগিয়ে আনার উদ্যোগেও সামিল হয়েছেন মুনিয়া দিদি। তাঁর নিজের কথায়, “সমাজে নারী-পুরুষ সমান বলা বলেও বাস্তবে তা দেখা যায় না। তাই আমরা নারীরা দেখিয়ে দিতে চাই যে আমরাও পারি। আমার টোটোর ওপরেরও তাই লেখা। যা সমাজের নারীদের উদ্দেশ্যেই লেখা।”

মুনিয়া দিদিকে আগামীর পথে অনেক শুভকামনা। তিনি যেন এভাবেই এগিয়ে যেতে পারেন নিজের লক্ষ্যে এটুকু প্রার্থনাই জারি রইল। আজকের সমাজের চোখে তিনি যে অনুপ্রেরণার অপর এক নাম! নিজের লক্ষ্যে তাঁকে যে সফল হতেই হবে…

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন.