মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২

ছোট্ট রুটি ঘুগনির দোকান চালিয়ে ভবঘুরেদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন অসহায় বাবা-মা

০৭:৫২ পিএম, জানুয়ারি ১৬, ২০২২

ছোট্ট রুটি ঘুগনির দোকান চালিয়ে ভবঘুরেদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন অসহায় বাবা-মা

নিজস্ব প্রতিনিধি, নদিয়াঃ প্রতিদিন আমাদের চারপাশের কতো ধরনের মানুষের কথা আমরা জানতে পারি, তাঁদের জীবনের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হই। এদের মধ্যে কারও কারও গল্প থাকে একদম অন্যরকমের। সেইসব গল্প হয়ে ওঠে অসাধারণ। কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের মাজদিয়া গ্রামের বাসিন্দা দিলিপ মোদক ও তাঁর স্ত্রী। এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবনের গল্পও তেমনই।

এই দিলিপ মোদকের মাজদিয়া স্টেশন সংলগ্ন একটি ছোট্ট রুটি ঘুগনির দোকান রয়েছে। পরিবারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন বলতে গেলে তার এই ছোট্ট দোকান। পরিবারে ছিলেন তাঁরা তিনজন। দিলীপ মোদক, স্ত্রী কৃষ্ণা মোদক ও একমাত্র ছেলে দীপঙ্কর মোদক। ছেলে পেশায় ওষুধের রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন। সবাই মিলে ছিল সুখের সংসার। দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু ভাগ্যের লিখনে সবটাই বদলে গেল। ভাগ্যের পরিহাসে গত এক বছর আগে তাঁদের একমাত্র পুত্র দীপঙ্করের কিডনির সমস্যার কারণে অকাল মৃত্যু হয়। পরিবারের একমাত্র ছেলে মারা যাওয়ায়, মা-বাবার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। চোখের জল হয়ে ওঠে তাঁদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

এরপর থেকেই ছেলের স্মৃতিকে আগলে রাখার জন্য দিলীপ মোদক ও তাঁর স্ত্রী একটা জিনিস ভেবে নেন যে, ছেলের মঙ্গল কামনায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করবেন। এই মানসিকতা নিয়েই প্রতিদিন সকালে উঠে কৃষ্ণা দেবী নীজের হাতে করে রান্না করে তুলে দেন স্বামীর হাতে। তাঁর ছেলে দীপঙ্কর যে সমস্ত খাবার খেতে ভালো বাসতো সেই ধরনের খাবার করেন। আর রান্নার সময় কৃষ্ণা দেবীর চোখের কোণে চিকচিক করে অশ্রুবিন্দু। আবার কোন সময় আপন মনে শোনা যায় বলতে, ‘দীপঙ্কর খেয়ে যা।’ সাড়া না পেতেই কৃষ্ণা দেবীর চোখ থেকে অশ্রুবিন্দু ঝড়ে পড়ে আর বলে ওঠেন, ‘তাইতো আমার ভুল তুই তো অভিমান করে চলে গেছিস, আরতো ফিরবি না। তবে, যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস।’

রান্না করা খাবার টিফিন বক্স ভর্তি করে স্বামীর হাতে তুলে দেন। আর স্বামী দিলীপ মোদক ছেলের ফটো বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দোকানের উদ্দেশ্যে সাইকেল চালিয়ে যান। সেই খাবার প্রত্যেকদিন তাঁর দোকানের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো ভবঘুরে ,অন্ধ, অসহায়, যারা দিনের পর দিন খেতে পায়না, তাঁদের প্রত্যেককে সেই খাবার নিজের বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে খাওয়ান। শুধু খাবার খাইয়েই তৃপ্তি হন না। যাদের হাতে তুলে খাওয়ার ক্ষমতা নেই, তাঁদের নিজে হাতে করে খাইয়ে দেন। আর যারা একটু নিজে হাতে করে খেতে পারেন, তাঁদের মুখেও অন্ন তুলে দেন। কারণ, তিনি এটাই মনে করেন যে এই ভবঘুরে পাগল লোকদের খাওয়ালে, তাঁদের একমাত্র ছেলের আত্মার শান্তি পাবে। এইভাবে ভবঘুরেদের খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর নিজের ছেলেকে দেখতে পান বলে জানালেন দিলীপ মোদক।

এই স্বার্থহীন সমাজে যখন মানুষ মানুষের অধিকার টাকা পয়সা নিয়ে লড়ে যাচ্ছে, তখন এরকম এক বিচিত্র দৃশ্যকে দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা সাধুবাদ জানিয়েছেন দিলীপ বাবুর এহেন প্রয়াসকে। এহেন প্রয়াসে দিলিপ বাবু নিজের ছেলেকে পাবেন না জানি, তবে, এটা বলা যেতেই পারে জীবনের বেঁচে থাকার রসদ পাবেন। দিলীপ বাবুর এহেন প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাতেই হয়।